সক্রেটিসের কলহপ্রিয় স্ত্রী

ইতিহাস ও সংস্কৃতি

আমরা প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক সক্রেটিসের নাম শুনেছি। দার্শনিক সক্রেটিস কিন্তু কোনো বই লিখেননি, বরং তাঁর শিষ্যরা তাঁকে নিয়ে বই লিখেছেন। বইগুলোতে সক্রেটিসকে একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর দার্শনিক তত্ত্বগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে আর সক্রেটিসের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর শিষ্যদের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। এসকল কথোপকথন কাল্পনিক না সত্যি তা যাচাই করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় কারণ সেগুলো আজ থেকে ২৫০০ বছর আগের কথা। তবে গল্পগুলো আমাদের জীবনবোধ গঠনে ও চিন্তা জগতকে নাড়িয়ে দিতে এখনও প্রাসঙ্গিক। এসব গল্পে সক্রেটিসের স্ত্রী জানথিপিকে বদমেজাজী, হিংসুটে, কলহপ্রিয় ও স্বামী নির্যাতনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যদিও প্লেটো তাঁর ‘ফেইডো’ বইয়ের প্রথম অংশে জানথিপিকে অনুগত স্ত্রী ও ভালো মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে অনেকে মনে করেন যে জানথিপির বদরাগী আচরণের জন্য সক্রেটিসই দায়ী ছিলেন।

সক্রেটিসের শিষ্য জেনোফোন তাঁর  ‘সিম্পোজিয়াম’ বইয়ে সক্রেটিসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, এরকম একজন মুখরা স্ত্রীকে সে কীভাবে সহ্য করে। সক্রেটিস সাদাসিধে জবাব দিয়েছিলেন, সে জানথিপিকে তর্কপ্রিয় আচরণের জন্য বিয়ে করেছিলেন। আর তাঁর স্ত্রীর অগ্নিমূর্তি  আচরণ যদি সহ্য করতে না পারেন তাহলে এথেন্সের অন্যান্য লোকজনের সাথে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করবেন। তারপর তিনি এক অশ্বারোহীর উদাহরণ টানেন, যিনি পোষমানা ঘোড়ার সাহায্যে ঘোড়া চালানো না শিখে দক্ষ ও সামর্থ্য অশ্বারোহী হওয়ার জন্য বন্য ঘোড়া বেছে নিয়েছিলেন।

এখান থেকে ধারণা পাওয়া যায়,  সক্রেটিস জানথিপিকে ভালোবাসেন বা জানথিপি ভালো মা ছিলেন অথবা জানথিপি সুন্দরী ছিলেন- এসব বিবেচনা করে জানথিপিকে বিয়ে করেননি। তিনি জানথিপিকে তাঁর দার্শনিক আলোচনার সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু জানথিপি সেরকম হতে চাননি।

আরেকটা বিষয় হলো, সক্রেটিস বিনামূল্যে তাঁর দার্শনিক আলোচনা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য ও জ্ঞানই এর একমাত্র বিনিময়মূল্য হতে পারে। এইজন্যই জানথিপিকে তার বাবার কাছ থেকে সংসার চালানোর খরচ আনতে হতো। সক্রেটিসের সংসারের প্রতি উদাসীনতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা জানথিপিকে বিষণ্ন করে রাখত।

শুধু তা নয়, সক্রেটিস রাতের বেলা দার্শনিক আলোচনা করতে সিম্পোজিয়ামে যেতেন যেখানে মদ পান করে মদ্যপ হয়ে ঘরে ফিরতেন। আরেকটি ধারণা হলো, সক্রেটিস আলসিবায়িডিস নামে একজন সুদর্শন তরুণ যুবককে ভালোবাসতেন।

আমরা সকলেই জানি যে, সক্রেটিসকে হেমলক নামে বিষ খাইয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা  হয়েছিল। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগে সেখানে জানথিপি ও তাঁর ছোট ছেলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের উদ্দেশ্যে কিছু না বলে বাসায় চলে যেতে বলেন যেন তিনি তাঁর শিষ্যদের সাথে শেষবারের মতো দার্শনিক আলোচনা করতে পারেন।

এসব বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় যে,  জানথিপির বদমেজাজী, হিংসুটে, কলহপ্রিয়তা ও স্বামী নির্যাতনের ঘটনা এমনিতেই ঘটেনি, এইজন্য সক্রেটিসের দায়ও কম ছিল না। সক্রেটিস এসব ব্যাপারে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। তাঁর একমাত্র খেয়াল ছিল দর্শন নিয়ে। তিনি বলতেন, “বিয়ে করা ভালো, যদি তুমি ভালো স্ত্রী পাও, তাহলে তুমি সুখে থাকবে আর যদি খারাপ স্ত্রী পাও তাহলে তুমি দার্শনিক হবে”।