মশা মশাইয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি

প্রকৃতি ও জীবন

মশা আপনাকে কামড়ায়, রক্ত শুষে নেয়, কামড়ানো স্হানগুলো ফোলে উঠে এবং সবশেষ অবস্থা ঐ জায়গাগুলোতে ক্ষত তৈরি হয় আর মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তো ভোগান্তির শেষ নেই। মশাবিহীন পৃথিবী আমরা সবাই চাই, কিন্তু মশা না থাকলে আমাদের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে কারণ বিভিন্ন ধরণের কীটপতঙ্গ, পাখি, বাদুড়ের খাদ্য তালিকায় মশা অন্যতম আর মশার লার্ভা জলীয় বাস্তুসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা বড়জোর যেটা করতে পারি সেটা হলো মশাকে আমাদের ঘরদোর ও আঙ্গিনা থেকে দূরে রাখতে, মশাবাহিত রোগগুলো না ছড়াতে সর্বোপরি মশাকে প্রতিরোধ করতে।

বাজারে মশা মারার অনেক ধরণের পণ্য সামগ্রী  পাওয়া যায় যা বেশিরভাগ সময়ই ঠিকমতো কাজে আসে না। আমাদেরকে আগে জেনে নিতে হবে এই রক্তচোষা কীটকে প্রতিরোধে কোনটা কার্যকর আর কোনটা কার্যকর না।     

মশার হাত থেকে বাঁচতে, হয় মশাকে আপনার চারপাশে ঘেঁষতে না দিয়ে তাড়িয়ে রাখতে পারেন নতুবা মশাকে মারার ব্যবস্থা নিতে পারেন। মশাকে তাড়ানোর জন্য ধোঁয়া, গায়ে মাখানোর মলম, বিভিন্ন ধরণের তেল ব্যবহার করা হয়। এগুলো মূলত মশাকে খানিকটা সময় দূরে সরিয়ে রাখে তবে একেবারে নিস্তার পাওয়া যায় না। অন্যদিকে মশা মারার জন্য বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও মশানাশক স্প্রে ব্যবহার করা হয় এতে অল্প পরিমাণে মশা মরে ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই উপকারী কীটপতঙ্গ মারা যায় যাতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

মশা বংশবিস্তারের উৎস ধ্বংস করুন

Image Source: thoughtco.com

অনেক প্রজাতির মশা জমে থাকা পানিতে বংশ বৃদ্ধি করে। এ কারণে বাড়ির আশেপাশে ফেলে দেয়া  পরিত্যক্ত পণ্যগুলো  যেমন প্লাস্টিকের বোতল, কন্টেইনার, ফুলের টব  সরিয়ে ফেলতে হবে। এসব জিনিসপত্রে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভাগুলো আস্তে আস্তে পরিনত মশায় রূপান্তরিত হয়। তবে সব মশাই যে পানিতে বংশবিস্তার করে তা কিন্তু নয়। এডিস প্রজাতির মশা যা ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের বাহক, তারা পানিতে ডিম পারে না। বরং পানির বাইরে ডিম পারে তবে ডিমগুলো ফোটার জন্য পর্যাপ্ত বর্ষাকাল বা বৃষ্টির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করে।

জৈবিক পদ্ধতি

Image Source: thoughtco.com

মশার হাত বাচাঁর সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো শিকারী প্রাণীর উৎপাদন করা যারা অপরিপক্ক মশা বা পরিনত মশাকে খেয়ে ফেলতে সক্ষম। এছাড়া মশার জন্য ক্ষতিকারক এমন কিছু এজেন্টের ব্যবস্থা করা যেগুলো মশা বাদে অন্য কোনো প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হবে না। অ্যাকুরিয়াম পালন করা কিছু মাছ, কই মাছ, মাছের পোনা মশা লার্ভা খেয়ে থাকে আর টিকটিকি,  ব্যাঙ, মাকড়শা, চিংড়ি, বাদুর,  ফড়িং পরিনত মশাকে খেয়ে থাকে। একধরণের ছত্রাক (Metarhizium anisoplilae and Beauveria bassiana)আছে যা মশাকে সংক্রামিত করে। আরেক ধরণের মাটির ব্যাকটেরিয়া (Bacillus thurigiensis israelensis) আছে যার আক্রমণে মশার লার্ভা খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না যার ফলে লার্ভাগুলো মারা যায়। এই ব্যাকটেরিয়া জমে থাকা পানিতে মিশিয়ে দিলে মশা বংশবিস্তার করতে পারে না এবং পোষা প্রাণী ও বন্য প্রাণীর জন্য তার ক্ষতিকর নয়। তবে এই ব্যাকটেরিয়া সপ্তাহে এক বা দুইবার মিশিয়ে দিতে হয় এবং এতে কিন্তু পরিনত মশা মারা যায় না। 

 

রাসায়নিক পদ্ধতি

Image Source: thoughtco.com

রাসায়নিক পদ্ধতিতে মশা নিধন বা তাড়ানোর নানাবিধ প্রক্রিয়া আছে। এর মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হলো মশাকে আকৃষ্ট করে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো করে মেরে ফেলা। মশা সাধারণত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, চিনি জাতীয় দ্রব্যের ঘ্রাণ, উত্তাপ ও ল্যাকটিক এসিড দ্বারা আকৃষ্ট হয়। একইভাবে ডিম ছাড়ার সময় ডিম বহনকারী মশা হরমোনের ফাঁদে আকৃষ্ট হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো ওভিট্র্যাপ (Ovitrap) যা কালো রঙের কন্টেইনারে পানি দ্বারা পূর্ণ থাকে। মশা জমে থাকা পানি দেখে ডিম ছাড়ে,  ডিমগুলো তখন একধরণের জালের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে পানিতে পড়ে কিন্তু মশা পরিনত হয়ে গেলে জালের ভিতর দিয়ে বেরুতে পারে না। কিছু ফাঁদ আছে যেগুলোতে মশাকে আকৃষ্ট করার জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় আবার কিছু ফাঁদ আছে যেগুলোতে মশার বংশবিস্তার উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়। তারপর এই ফাঁদগুলোতে হয় শিকারী প্রাণী (যেমন: মাছ) দ্বারা বা রাসায়নিক ব্যবহার করে মশার লার্ভা ও মশা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া পানিতে তেল বা কেরোসিন ঢেলে দিলে মশার লার্ভাগুলো তাদের শ্বাসনলের মাধ্যমে নি:শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না কারণ তেল বা কেরোসিন পানির স্থিতিস্থাপকতায় পরিবর্তন আনে।

Image Source: abilitymagazine.com

এছাড়াও আমরা আমাদের হাতের সাহায্যে মশা মেরে থাকি। তবে পরিমানে বেশি হলে বৈদ্যুতিক জ্যাপার বা বৈদ্যুতিক ব্যাট ব্যবহার করে থাকি। এসব ক্ষেত্রে মশা মরে ঠিকই কিন্তু উপকারী কীট-পতঙ্গগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে মশার হাত থেকে বাঁচতে হলে মশা মারার বিভিন্ন পদ্ধতি আপনাকে ব্যবহার করতে হবে, তাছাড়া আপনি নিস্তার পাবেন না। আশার কথা হলো, মশাকে বন্ধ্যা করার জন্য অর্থাৎ মশারা যাতে বংশবৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সে পর্যন্ত অবশ্য মশা মশাইয়ের যন্ত্রণা একটু সহ্য করে নিতিই হবে।