মঙ্গল শোভাযাত্রা: বাঙালির অপরিমেয় বৈশাখী উৎসব

ইতিহাস ও সংস্কৃতি

মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির বাংলা নতুন বছরকে বরণ করার একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আয়োজনে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রমনা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এই শোভাযাত্রা বের করা হয়। অসম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে পুরোনো বছরের শত গ্লানি মুছে আগামী বছরের সকল অশুভ শক্তিকে হটিয়ে সবার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করা হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হলো অতিকায় ভাস্কর্য যেমন: হাতি, টেপাপুতুল, পাখি, ষাড়, লক্ষীপেঁচা, ঘোড়া, বাঘ, কুমীরসহ বিচিত্র ধরণের মুখোশ, হাতপাখা, জলরঙের চিত্রকর্ম ও চিত্রিত সরা। এই বর্ণাঢ্য বৈশাখী উৎসবে শিশু-কিশোরসহ হাজারো সাধারণ মানুষ রংবেরঙের পোশাকে বিশেষ করে মেয়েরা শাড়ী ও ছেলেরা পাঞ্জাবী পরিধান করে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া বাঙালির গ্রামীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য কৃষক, জেলে, বর-কণে সেজে বাশিঁ ও ঢাক-ঢোলের তালে লোকজ সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানস্থলকে মাতিয়ে রাখে।

১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখে সর্বপ্রথম স্বৈরাচারী সরকারের জুলুম, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে চারুকলা ইনিস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এ শোভাযাত্রা বের করা হয়। সেই বছরই সেটা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের  মনে দাগ কাটতে সাহায্য করে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরণের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহনকারী প্রতীকী শিল্পকর্ম, নানা রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি বহন করে নাচ-গান করা হয়।

প্রতি বছর মঙ্গল শোভাযাত্রার একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে আর এবারের প্রাতপাদ্য হলো- মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির প্রতীক বহন করার পাশাপাশি অন্যায় অবিচারের বিবরদ্ধে প্রতিবাদ করার মনোবল যোগায় এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার প্রেরণা দেয়। 

মঙ্গল শোভাযাত্রার আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটা আযোজনে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেয়া হয় না। একমাস আগে থেকে চারুকলা অনুষদের শিক্ষক শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীরা তাঁদের চিত্রকর্ম, চিত্রিত সরা, মুখোশ ও অন্যান্য শোপিস বিক্রি করে যা পান, তাই দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু ঢাকা শহর কেন্দ্রিক উৎসব নয়। এটা সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা শহরে বৈশাখী মেলার পাশাপাশি বর্ণীল আয়োজনে সকল স্তরের জনগণের উৎসাহ উদ্দীপনায় পালিত হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা দেশের গন্ডি পেরিয়ে এর বিশ্বজনীন মানবকল্যাণের আদর্শ নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) ‘Intangible Cultural Heritage’ বা মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করেছে ২০১৬ সালে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধিশালী জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।