কাগজের মুদ্রা এলো কীভাবে?

ইতিহাস ও সংস্কৃতি

সভ্যতার শুরুর দিকে পণ্য বা সেবার পরিবর্তে পণ্য বা সেবার বিনিময় প্রথা চালু ছিল। যেমন, কারো কাছে এক বস্তা ধান আছে তার বিনিময়ে অন্য এক জনের কাছ থেকে সে এক বস্তা গম নিল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তখনই যখন, যার যেটা প্রয়োজন সে অনুযায়ী পণ্য বা সেবা মিলিয়ে নিতে পারল না। কারো কাছে হয়ত মাছ আছে সে চাচ্ছে এর বিনিময়ে চাল নিতে, কিন্তু যার কাছে চাল আছে তার দরকার সবজি। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মানুষ কয়েকটি মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন লবণ, তামাক, শস্য দানা, গবাদিপশুকে বিনিময় মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করে লেনদেন শুরু করল। কিন্তু তাও সুখকর হলো না, কারণ এসব  পণ্য সংরক্ষণ করা যেমন যেত না তেমনি বহনযোগ্যও ছিল না। তখন মানুষ অপেক্ষাকৃত সংরক্ষণযোগ্য ও বহনযোগ্য ধাতব মুদ্রার দিকে ঝুঁকে।

 

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব এগারো শতকে চীনের শাং রাজবংশের (Shang Dynasty) রাজত্বকালীন সময়ের সমাধিক্ষেত্রগুলো থেকে তামার যে ধাতব মুদ্রা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সে সময়টাই ধাতব মুদ্রা ব্যবহারের প্রারম্ভকাল। বেশীরভাগ সময়ই তামা, রুপা, স্বর্ণের ধাতব মুদ্রা ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। ধাতব মুদ্রার সুবিধা ছিল, এগুলো টেকসই ছিল এবং এগুলোর জাল করা যেতো না পাশাপাশি এগুলোর নিজস্ব মূল্যও ছিল। আর অসুবিধা ছিল, পরিমাণে বেশি হলে বহন করা কষ্টকর ছিল। ধাতব মুদ্রাগুলি মাঝখানে চারকোণাকৃতির ছিদ্র করা হতো যাতে মালার মতো ঝুলিয়ে বহন করা যায়।

খ্রিস্টপূর্ব এগারো শতকের চীনের বিনিময় প্রথার কিছু দুর্লভ চিত্র।

ট্যাং রাজবংশের (Tang Dynasty) রাজত্বকালে ব্যবসায়ীরা তাদের ধাতব মুদ্রাগুলি বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে জমা করে এর পরিবর্তে জমাপত্র নিত। এই জমাপত্রের বিনিময়ে  ব্যবসায়ীরা পণ্য বা সেবা ক্রয় করত। বিক্রেতাগণ পরবর্তীতে সেই জমাপত্র দেখিয়ে ধাতব মুদ্রা তুলে নিত। এই লেনদেনগুলো মূলত তৎকালীন সিল্করোডের আশেপাশে হতো। কিন্তু এই জমাপত্রগুলো ব্যক্তিগত তৈরি করা হতো বিধায় সত্যিকারের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার হতো না।

সুং রাজবংশের (Song Dynasty) রাজত্বকালের (৯৬০-১২৭৯) প্রথম দিকে সরকার ধাতব মুদ্রা জমাকরণের দোকান নির্ধারণ করে দেয় যেখানে লোকজন তাদের ধাতব মুদ্রা জমা দিয়ে জমাপত্র সংগ্রহ করত। এগারো শতকে আনুমানিক ১০২৩ সালে সুং কর্তৃপক্ষ নিজেরা এই লেনদেন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাগজের মুদ্রার প্রচলন করল এবং মুদ্রার নাম দিল ‘জিয়াওঝি’ (jiaozi)। তারা ছয় রঙের কালি ব্যবহার করে কাঠের ব্লক দিয়ে কাগজের মুদ্রা তৈরির কারখানা স্থাপন করে। এই ধরণের কারখানা চীনের চেংদু, হাংঝু, হুইঝুও ও আংকি নামক জায়গায় স্থাপন করা হয়। জালিয়াতি ঠেকানোর জন্য প্রত্যেক কারখানাই ভিন্ন ভিন্ন তন্তুর সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত কাগজ দিয়ে মুদ্রা বানাতো। এই কাগজের মুদ্রাগুলি  সুং রাজত্বের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মাত্র তিন বছর চলে। তারপর ১২৬৫ সালে সুং সরকার তার রাজ্যে একক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করে যা মাত্র নয় বছর চলে। ১২৭৯ সালে মোঙ্গলদের কাছে সুং রাজত্বের পতনের পর ইউয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কুবলাই খান (Kublai Khan) ‘চাও’ (Chao) নামের কাগজের মুদ্রা চালু করে। মোঙ্গলরা সেটা পারস্যের সাথে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। কুবলাই খানের দরবারের সভাসদ বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কো পোলো তাঁর বর্ণনায় সরকার কর্তৃক কাগজের মুদ্রা ছাপানোকে প্রশংসা করেন। যদিও অতিরিক্ত কাগজের মুদ্রা ছাপানোর ফলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছিল, সে সমস্যা সমাধানের আগেই ১৩৬৮ সালে ক্ষণস্থায়ী ইউয়ান রাজবংশের পতন হয়। এরপর মিং রাজবংশের (Ming Dynasty) রাজত্বকালের (১৩৬৮-১৬৪৪) প্রথম দিকে কাগজের মুদ্রা ছাপানো হলেও ১৪৫০ সালে সেটা বন্ধ করে রূপার মুদ্রা চালু করে।