উত্তর কোরিয়া: অন্যরকম এক দেশ

সাম্প্রতিক বিশ্ব

পূর্ব এশিয়ার দেশ উত্তর কোরিয়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উত্তর কোরিয়া নিজেকে সমাজতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর দেশ হিসেবে দাবি করলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন দেশটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকে। ভিনদেশী প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দেশটি সদা প্রস্তুত। বিদেশী গণমাধ্যম ও  আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখানে প্রবেশাধিকার পায় না। এছাড়া যেকোনো প্রকার সাহিত্যকর্ম ও চিত্রকলা প্রকাশের ক্ষেত্রে চরম নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।  একারণে উত্তর কোরিয়ায় সৃষ্টিশীলতা কম স্বাধীনতা ভোগ করা যায় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও খুব একটা লক্ষ করা যায় না।

উত্তর কোরিয়ায় ২.৫ (আড়াই) কোটির উপরে লোক বসবাস করে যার মধ্যে বেশিরভাগই জাতিগতভাবে সমশ্রেণিভুক্ত। এখানে খুবই অল্প পরিমাণে সংখ্যালঘু চাইনিজ ও জাপানিজ লোক বসবাস করে। এদেশের সবাই কোরিয়ান ভাষায় কথা বলে। সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হলেও তা মানা হয় না। রাষ্ট্র যে ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করে তারাই ধর্মীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে কোরিয়ানরা কনফুসিয়াস ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বর্তমানে প্রায় ৬৪ শতাংশ উত্তর কোরিয়ান কোন ধর্মই পালন করে না। ১৬ শতাংশ কোরিয়ান শামানধর্ম, ১৪ শতাংশ  চন্দধর্ম, ৫ শতাংশ বৌদ্ধধর্ম ও ২ শতাংশ খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী।

উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার রন্ধনপ্রণালী একরকম হলেও উত্তর কোরিয়ার খাবারে মসলার পরিমাণ তুলনামূলক কম। ভাত ও লবণাক্ত গাঁজনকৃত সবজি তাদের প্রধান খাবার।  উত্তর কোরিয়ার লোকজন সাধারণত মুরগি, শুয়োর, খরগোশ ও ছাগলের মাংস খেয়ে থাকে তবে বিশেষ দিন ছাড়া মাংসজাতীয় খাবার খায় না। কফি, চা ও কোমলপানীয় এখানকার লোকজনের প্রিয় পানীয়। তবে মদ পান করা এদেশের সংস্কৃতির অংশ। ১৮ বছর বয়স হলে সবাই মদ খাওয়ার বৈধতা পেয়ে যায়।

বই পড়া উত্তর কোরিয়ার লোকজনের অবসর সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম। দেশটিতে লেখক ও সাহিত্যিকদের বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয় যদিও কোন বই প্রকাশিত হবে না হবে সেটা পুরোপুরি রাষ্ট্রযন্ত্রের মর্জির উপর নির্ভর করে। যে বইগুলো উত্তর কোরিয়ার নেতাদের প্রশংসা করে তাদের মহত্ত্ব তুলে ধরে এবং দেশটির ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ের বইগুলো প্রকাশে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের সমালোচনা করে এমন ধরণের বই কখনও প্রকাশ হতে দেওয়া হয় না।

উত্তর কোরিয়ার দেশপ্রেমের ইতিহাস তুলে ধরতে সারাদেশে বীরযোদ্ধা  ও  গেরিলা যোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরণের ভাস্কর্য দেখা যায়।  দেশটির নেতা কিম সাং ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ম্যুরালচিত্র, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম  সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়।

উত্তর কোরিয়ায় সাহিত্য ও চিত্রশিল্পের মতো গান, চলচ্চিত্র, অভিনয় শিল্প সবক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে বৈপ্লবিক গান ও লোক সঙ্গীত প্রসারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের বার্তা প্রচারের জন্য গান উৎসব ও অপেরা সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়। ব্যান্ড মিউজিকও উত্তর কোরিয়ায় খুবই জনপ্রিয়।

ফুটবল, বাস্কেটবল, বক্সিং, টেবিল টেনিস ও জিমন্যাস্টিকস উত্তর কোরিয়ার জনপ্রিয় খেলা। উত্তর কোরিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সুনাম আছে। প্রায় ১.৫ লক্ষ দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল এক স্টেডিয়াম আছে। দেশটির শিক্ষা কারিকুলামে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রত্যেকটি স্কুলে খেলাধুলার সুবিধা আছে।

উত্তর কোরিয়ায় নারী-পুরুষ সমান অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করে। বিশাল সংখ্যক নারী দেশটির শ্রমবাজারে কাজ করে, তারা তুলনামূলক হালকা ধরণের শিল্প কারখানায় কাজ করে। দেশটিতে বিবাহ অনুষ্ঠান জাঁকজমকপূর্ণ হয় না, বর-কণের নিকটাত্মীয়দের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়। এমনকি কোন মধুচন্দ্রিমারও প্রচলন নেই। বিয়ে সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে নতুন দম্পতির জন্য বাসস্থান বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দকৃত বাসা অনেক ছোট হয় কারণ দেশটির বেশিরভাগ পরিবারই এককভাবে  বসবাস করে। উত্তর কোরিয়ায় এগারো বছর শিক্ষা গ্রহণ  বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। যৌথ খামার ও কারখানাগুলোতে কর্মজীবীদের সন্তানের জন্য নার্সারি স্কুলের ব্যবস্থা করা আছে। নিজেদের ভাষা ব্যবহারের ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন, কোন প্রকার বাইরের সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা যেন তাদের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ না করতে পারে সেজন্য বিদেশী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাদেরকে সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদী, পুঁজিবাদ বিরোধী, শ্রেণি সংগ্রাম, দেশপ্রেমের শিক্ষা প্রদান করা হয়।