ইবনে বতুতা: একজন মুসলিম পরিব্রাজক

ইতিহাস ও সংস্কৃতি

আমরা অনেকেই মার্কো পোলো, ক্রিস্টফার কলম্বাস,  জেমস কুকের নাম শুনে থাকব। অনেকেই হয়তো মধ্যযুগীয় মুসলিম পণ্ডিত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার নাম শুনিনি যে সারা পৃথিবীর ৭৫,০০০ মাইল ঘুরে বেড়িয়েছেন। মরোক্কোর তাঞ্জিয়ারে ১৩০৪ সালে জন্ম নেয়া এই পরিব্রাজক উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, চীন-সহ ৪৪টি দেশে ভ্রমণ করেছেন যা তিনি তার ভ্রমণ বিষয়ক বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন।

মুসলিম বিচারকের ঘরে জন্ম নেওয়া ইবনে বতুতা ২১ বছর বয়সে ১৩২৫ সালে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। যাওয়ার পথে সিরিয়া, মিশর, জেরুজালেম দেশের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন ও একজন সুন্দরী মহিলাকে বিয়েও করেন। ১৩২৬ সালে পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেন ঐ বছরই হজ্বব্রত পালন করেন। তিনি সেখানেই হয়তো তাঁর ভ্রমণ শেষ করতে পারতেন। তিনি একরাতে স্বপ্নে দেখলেন যে, বড় পাখির ডানায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তারপর অন্ধকার ও সবুজ দেশে অবতরণ করেন। একজন বুজুর্গ ব্যক্তি তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা স্বরূপ বলেন যে, তাঁর কখেন সারা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত ঘুরে বেড়াতে হবে এবং তিনি তাই শুরু করলেন।

তখনকার সময়ে ভ্রমণ এতোটা সুখকর ছিল না। ইবনে বতুতাকে পায়ে হেটে, বিভিন্ন প্রকার অযান্ত্রিক গাড়িতে চেপে, উটে চেপে, জাহাজে করে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। পথঘাটে ছিনতাইকারী, ডাকাতের কবলে পড়তে হয়েছে, জাহাজ ‍ডুবেছে, শরীর অসুস্থ হয়েছে। কোন এলাকায় গেলে তিনি সেখানকার স্থানীয় শাসকদের কাছ থেকে রৌপ্য মুদ্রা, স্বর্ণ, খাবার, জামা-কাপড়, মোমবাতি, বিশ্রামের স্থান ও দাসও উপহার হিসেবে পেতেন। কারণ মুসলিম পন্ডিত ও বিচারক হিসেবে তারা তাঁকে সম্মান করে অতিথির মর্যাদা দিত।

তারপর ১৩৩১ সালে ইয়েমেন, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া হয়ে লোহিত সাগরে যাত্রা করলেন। তিনি আরেকবার মক্কা যাওয়ার আগে পেলেস্টাইন হয়ে গেলেন। কনস্টান্টিপোলে তিনি হাজিয়া সোফিয়া নামে খ্রিষ্টান ধর্মের উপসনারয় দেখে মুগ্ধ হন এবং বাইজেন্টাইন সম্রাটের সাথে দেখা করেন। তারপর তিনি আফগানিস্থানে যান সেখান থেকে বরফাবৃত হিন্দু-কুশ  পর্বত পেরিয়ে ভারতে পৌছেন।

১৩৩৩ সাল থেকে শুরু করে ইবনে বতুতা দিল্লীর সুলতানের দরবারে কয়েক বছর বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা শুরু হলে তাকে চীনে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। যাত্রা পথে জাহাজডুবি হলে তিনি সহায়সম্বলহীন অবস্থায় আবার ভারতে চলে আসেন কিন্তু  এ বিফলতার কারণে শাস্তিস্বরূপ সুলতান মৃত্যুদন্ড দিতে পারে ভেবে তিনি আর দিল্লিতে ফিরে যাননি। তিনি আবারও চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার পথে তিনি মালদ্বীপ হয়ে যান এবং সেখানে তিনি প্রধান বিচরেকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানকার সুলতানের মেয়েকে বিয়ে করেন। এখানে বলে রাখা যায় য়ে, তিনি সারা জীবনের ভ্রমণে ১০টি বিয়ে করেন। এরপর তিনি শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম হয়ে ১৩৪৫ সালে চীনে পৌছেন। তিনি তাঁর লেখায় চীনের ‘গ্রেট ওয়াল’-এর বর্ণনা দেন ও হাংঝু প্রদেশের কাঠের নৌকার প্রশংসা করেন। তিনি চীন থেকে ভূমধ্যসাগরের সারদিনিয়া দ্বীপ ও মরোক্কোর ফেজ শহর হয়ে তাঁর জন্মস্থান তাঞ্জিয়ারে যান ১৩৪৯ সালে। কিন্তু তিনি বেশিদিন ঘরে থাকেননি।

জিব্রাল্টার, মার্বেলা, ভ্যালেন্সিয়া, গ্রানাডা হয়ে তিনি ১৩৫০ সালে স্পেনের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। এরপর তিনি মারাকেশ, মালি, টিম্বাকটু ও সাহারা মরুভূমি হয়ে তিনি ১৩৫৪ সালে আবার মরোক্কোতে ফিরে আসেন। মরোক্কোর সুলতান ইবনে জুঝাই নামে একজন কবিকে ইবনে বতুতার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাঁকে তাঁর ৩০ বছরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে বলেন। ইবনে বতুতার নিজের ভ্রমন অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা দুজন একত্রে মিলে “রিহলা” নামে আরবী একটি ভ্রমনকাহিনী লিখেন। ১৮০০ সালে এক জার্মান পন্ডিতের হাতে এর একটি পান্ডুলিপি আসলে তা মুসলিম জগতের বাইরে আসে এবং ইবনে বতুতার সম্পর্কে জানতে পারে এবং ১৮১৮ সালে এর একটি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়। ইবনে বতুতার ভ্রমন কাহিনীটি ইতিহাসবিশারদদের ১৪ শতকে মুসলিমদের জীবন-যাপন, সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মরোক্কোর সুলতানের অভিপ্রায়ে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৩৬০ সালের শেষের দিকে ইবনে বতুতা মৃত্যুবরণ করেন।